আবুল হাসানাত আকাশ, শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি:
শখের বশে ঘরের বারান্দায় কয়েকটি গাছ দিয়ে শুরু। সেই শখই একসময় রূপ নিয়েছে সম্ভাবনাময় ব্যবসায়। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতায় মাদারীপুরের শিবচরে ইনডোর প্ল্যান্টের নার্সারি গড়ে তুলেছেন নারী উদ্যোক্তা তানজিলা আখি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’। তানজিলার দাবি, নার্সারিতে থাকা গাছের চারার আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫ লাখ টাকা। এ ব্যবসা থেকে মাসে গড়ে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করছেন তিনি। কোনো কোনো মাসে আয় তিন থেকে চার লাখ টাকায় পৌঁছায়। তাঁর উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে দুজনের।
তানজিলা আখির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পের শুরু ২০১৯ সালে। তখন ঢাকার একটি ডিজাইনার হাউসে চাকরি করতেন তিনি। গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে বাসার বারান্দায় গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি বাগান। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাছ সংগ্রহের আগ্রহ। একপর্যায়ে শখের বাগানই হয়ে ওঠে তাঁর নতুন স্বপ্নের ভিত্তি।
২০২০ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয় তানজিলাকে। ওই সময় স্বামী-সন্তানের কাছ থেকেও দূরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। নিঃসঙ্গ সেই দিনগুলোতে বারান্দার গাছগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর সঙ্গী। গাছের পরিচর্যা করতে গিয়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়। বাড়তে থাকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সংগ্রহের আগ্রহ।
পরে চাকরি ছেড়ে সংগ্রহে থাকা গাছগুলো নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল নরসিংদীতে চলে যান তিনি। সেখানে নতুন করে বাগান গড়ে তোলেন এবং শুরু করেন গাছের চারা বিক্রি। ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন বৃক্ষমেলায় অংশ নিয়ে ইনডোর প্ল্যান্টের স্টলও পরিচালনা করতেন।
তবে উদ্যোক্তা হওয়ার পথটি সহজ ছিল না। ২০২৪ সালে নরসিংদীতে ভাড়া বাসায় থাকার সময় বাগান নিয়ে প্রতিবেশীদের আপত্তির মুখে পড়েন তানজিলা। একপর্যায়ে স্বামীকে নরসিংদীতে রেখেই সব গাছ নিয়ে শিবচরে ফিরে আসেন তিনি। পরে পরিবারের সহযোগিতায় পারিবারিক আট শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাছের সংগ্রহ, ক্রেতাদের আগ্রহ ও ব্যবসার পরিধি।
বর্তমানে শিবচর থানা রোডে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে অবস্থিত নার্সারিটিতে রয়েছে ফিলোডেনড্রন, মনস্টেরা, অ্যাগলোনিমা, সিঙ্গোনিয়াম, থাই লিলি, অর্কিড, ফিটোনিয়া, পারলার পাম, বেগোনিয়া ও পথোসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ইনডোর প্ল্যান্ট। তানজিলা আখির ভাষ্য, তাঁর সংগ্রহে রয়েছে এক হাজারের বেশি প্রজাতির গাছ। এসব গাছের চারার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে নার্সারির পরিচর্যা ও ব্যবসায়িক কাজে তাঁকে সহযোগিতা করছেন দুজন কর্মচারী।
তানজিলা আখি বলেন,করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর গাছের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সেখান থেকেই গাছ সংগ্রহ শুরু করি। একটু একটু করে গড়ে তুলেছি ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি। ব্যবসা শুরুর পর নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা এসেছে। সবকিছু অতিক্রম করে এখন আমার নিজের একটি বাগান হয়েছে। এখান থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করছি। আমার এখানে দুজন কর্মচারী আছেন। আগামী মাস থেকে আরও একটি বাগান শুরু করতে যাচ্ছি।
তানজিলার এ উদ্যোগে সহযোগিতা করছেন তাঁর স্বামী মো. বিল্লাল হোসেন। সংসার ও দুই সন্তানের দেখাশোনার পাশাপাশি স্ত্রীর ব্যবসায়িক কাজেও সহযোগিতা করেন তিনি।
বিল্লাল হোসেন বলেন,গাছ নিয়ে কাজের প্রয়োজনে তানজিলাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। তাই অফিসের কাজ শেষে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করি, সন্তানদেরও দেখাশোনা করি। আমরা দুজন মিলে সংসারের কাজ সামলাই। এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে ওর পাশে আছি।
তানজিলার উদ্যোগের প্রশংসা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। প্রতিবেশী মিলন বলেন, তাঁর পরিচর্যায় এত সুন্দর একটি বাগান গড়ে ওঠায় এলাকাবাসী গর্বিত। একজন নারী নিজের পরিশ্রমে এমন উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন, যা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক।
আরেক প্রতিবেশী সাজ্জাদ হোসেন খান বলেন, শিবচরের মতো এলাকায় এমন পরিবেশবান্ধব নার্সারি দেখে তিনি আনন্দিত। নতুন ও পুরোনো উদ্যোক্তাদের এ ধরনের উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান খান বলেন, কৃষি বিভাগ থেকে এ ধরনের তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে শিবচরের অনেক তরুণ বিদেশে পাড়ি জমান। এ পরিস্থিতিতে কৃষি ও নার্সারিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। তরুণেরা যাতে নিজেদের উদ্যোগে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সে জন্য তাঁদের উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া সবার দায়িত্ব।
বারান্দার কয়েকটি গাছ থেকে শুরু হওয়া তানজিলা আখির এই উদ্যোগ এখন স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে আরও একটি বাগান গড়ে তুলে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চান তিনি। গাছের প্রতি ভালোবাসাকে পুঁজি করে তাঁর এই পথচলা স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রেও অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।