মাদারীপুরে সার ডিলার নিয়োগের শুরুতেই অনিয়ম, অবৈধ মজুদকারীকে সেই ডিলারই পাচ্ছে নিয়োগ


admin প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১৫, ২০২৬, ৯:১১ PM /
মাদারীপুরে সার ডিলার নিয়োগের শুরুতেই অনিয়ম, অবৈধ মজুদকারীকে সেই ডিলারই পাচ্ছে নিয়োগ

মাদারীপুর প্রতিনিধিঃ

মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুর বাজারে মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্স ও সোমা ট্রেডার্সের অনিয়ম শেষ নেই। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকে বরাবরই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কৃষকদের জিম্মি করে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অধিক মুনাফায় সার বিক্রি করে যাচ্ছেন তারা। সেই মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মহাদেব কুন্ডু ও সোমা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মিলন কান্তি দাশ কোন প্রতিযোগিতা ছাড়াই আবারো তাদের প্রতিষ্ঠানকে সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ ও সার বিতরণের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

শুধু তাই নয়, মস্তফাপুর ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোদ উপজেলা কৃষি অফিসার দীপ্তি রানি সরকার নিজেই এ অনিয়ম করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও দীপ্তি রানী সরকার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়ন থাকলেও সারের ডিলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ১৩টি ইউনিয়নে। সেখানে মস্তফাপুর ও রাস্তি ইউনিয়নের সারের ডিলারদের সঙ্গে পূর্ব থেকে জরুরী সভা করে তাদের নির্ধারণ করা হয় যে, কে কোন ওয়ার্ডে ডিলার পাবে। সূত্র বলছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ওই সিন্ডিকেট সভায় কৃষি অফিসার দীপ্তি রানী সরকার নিজেই উপস্থিত ছিলেন। তিনি ডিলারদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে আগেভাগেই মস্তফাপুর ও রাস্তি এলাকার ৬ জন ডিলারের নাম লিপিবদ্ধ করে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কৃষি বিভাগ বলছে, তারা কোন অনিয়ম করেনি।

প্রজ্ঞাপণে থাকা নীতিমালা অনুযায়ী, যে ইউনিয়নে বিসিআইসি ও বিএডিসি সারের ডিলার রয়েছে তাদের মধ্যে থেকে প্রতি ইউনিয়নে ৩ জন করে ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। পরে সমন্বয় করে তাদের সীমানা নির্ধারণ করা হয় এবং অন্য যেসব ইউনিয়নে বিসিআইসি ও বিএডিসি লাইসেন্স নাই বা শূন্য রয়েছে সেই ইউনিয়নগুলোর জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির জন্য সুপারিশ প্রেরণ করেছেন বলে জানায় কৃষি বিভাগ।

এদিকে মস্তফাপুর বাজারের মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্সের মহাদেব কুন্ডু ও সোমা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মিলন কান্তি দাশ সারের ডিলারে সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে সার মজুদ করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন তিনি। এ ছাড়াও সম্প্রতি ৪৫০ বস্তা পটাশ সারসহ এক ট্রাক অবৈধ ভাবে ক্রয় করা সার গুদামঘরে মজুদ করেন মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মহাদেব কুন্ডু। পরবর্তীতে তার অপরাধের প্রমাণ পাওয়া সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাদারীপুর অফিস থেকে জগদীশ ট্রেডার্সে অভিযান চালান। পরে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মহাদেব কুন্ডু তার অপরাধ স্বীকার করায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তররের সহকারী পরিচালক সুচন্দন মন্ডল অভিযুক্ত ডিলারের স্বত্বাধিকারীকে ৬০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা আদায় করেন। অন্যদিকে সম্প্রতি উপজেলা কৃষি অফিসার দীপ্তি রানি সরকার জগদীশ ট্রেডার্সে অভিযান চালায় এবং অনিয়মের প্রমাণ পেলেও তিনি কোন পর্দক্ষেপ নেয়নি। বরং তিনি অন্য ব্যবসায়ীদের হুমকি ধামকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মস্তফাপুর বাজারে কৃষকদের কাছে সার বিক্রির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মহাদেব কুন্ডু ও সোমা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মিলন কান্তি দাশ। তাদের অধীনে অন্তত ৩০ জন সাব ডিলার রয়েছে। তারা সদর উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় সার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। এ কারণে তারা দুজন সিন্ডিকেট করে একাধিক গুদামে সার মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সার সংকটের ফলে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অধিক মূল্যে সার ক্রয় করতে হচ্ছে। এ ছাড়াও সার কারখানা থেকে সিন্ডিকেট করে নিয়ম না মেনেও তারা সার তার নিজ গুদামে মজুদ করেন। যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
দীর্ঘদিন ধরে মস্তফাপুর এলাকার অসংখ্য কৃষক মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্স ও সোমা ট্রেডার্সকে অপসারণ ও সারের ডিলার বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল। তীব্র আপত্তি থাকা সত্বেও কৃষি অফিসের যোগসাজশে সিন্ডিকেট করে সার মজুদ করে বিক্রি করার কাজ অব্যাহত রয়েছে মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্স ও সোমা ট্রেডার্স। এ ছাড়াও মস্তফাপুর বাজারে কালাম বয়াতী ও তার স্ত্রীর নামে সাজিদ এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি লাইসেন্স রয়েছে। একই পরিবারে দুটি লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তারা অবৈধভাবে লাইসেন্স দুটি পরিচালনা করছেন। আবার তারা লাইসেন্স দুটি ভাড়া দিয়েও ব্যবসা করে যাচ্ছেন। যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এরপরেও কালাম বয়াতী ও তার স্ত্রীর নামে থাকা লাইসেন্স পূর্ণরায় কৃষি বিভাগ থেকে সারের লাইসেন্সের জন্য নবায়ন করেছেন।

২০২৫ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, পূর্বের কোন ডিলারের যদি কোন অনিয়ম থাকে তাহলে ডিলারের কার্যক্রম আরো নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে ডিলারশিপ বাতিল বা নবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। নীতিমালায় অনুসারে অনিয়মে জড়িত থাকা ডিলার নতুন করে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ না থাকলেও মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্স মস্তফাপুর ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সার ডিলার হিসেবে কৃষি অফিস থেকে আগেভাগেই নিয়োগ নিশ্চিত করে রেখেছেন। এ কারণে মাদারীপুর সদর উপজেলায় ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে মস্তফাপুরসহ দুটি ইউপি বাদ দিয়ে ১৩টি ইউনিয়নে সারের ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

জানতে চাইলে মেসার্স জগদীশ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মহাদেব কুন্ডু বলেন, আমার বিসিআইসি সারের ডিলাল, যা বৈধ। সব নিয়ম মেনেই সার ক্রয়-বিক্রয় করে আসছি। যা কৃষি বিভাগ অবগত রয়েছেন। তারাই তো আমাদের ডেকে নিয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এখানে আমার কোন অনিয়ম নেই।

এ সম্পর্কে মাদারীপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার দীপ্তি রানি সরকার বলেন, ২০২৫ সালের নীতিমালা মেনেই আমরা সব কাজ করেছি। এখানে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। বিসিআইসি ও বিএডিসি লাইসেন্স নাই বা শূন্য রয়েছে সেই ইউনিয়নগুলোর জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আর যে ইউনিয়নে বিসিআইসি ও বিএডিসি লাইসেন্স আছে তাদের মধ্যে সমন্বয় করে ডিলারশিপ দেওয়া প্রক্রিয়া করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ নীতিমালা মেনেই করা।