সমুদ্রেই হারাল স্বপ্ন: শিবচরের কয়েক পরিবারে শোকের ছায়া


admin প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ৮, ২০২৫, ১০:২৬ PM / ১৮৫
সমুদ্রেই হারাল স্বপ্ন: শিবচরের কয়েক পরিবারে শোকের ছায়া

ইতালিতে নতুন জীবনের আশায় ঘর ছাড়লেও ভাগ্যের চক্র তাদের আর ফিরতে দিল না—এমনই বেদনাহত বাস্তবতার মুখোমুখি এখন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কয়েকটি পরিবার।

লিবিয়া উপকূলে ইতালিগামী একটি ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর এক মাস ধরে নিখোঁজ থাকা যুবকদের কোনো খোঁজ মিলছে না। তাদের না–ফেরার এই দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে অকথ্য শোক ও অসহায় অপেক্ষা।

নিখোঁজদের মধ্যে আছেন বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের তরুণ নিশাত মাতুব্বর এবং বাঁশকান্দির ফারহান খান রোমান—এলাকার স্বপ্নবাজ দুই যুবক। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন শিবচরের যুবক একই দালালের মাধ্যমে ইতালির পথে যাত্রা করেছিলেন বলে পরিবারসূত্রে জানা গেছে।

শুক্রবার সকাল থেকেই নিশাত মাতুব্বরের বাড়িতে চলছে একটানা ক্রন্দন। ছয় মাসের শিশুকে আঁকড়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন তার স্ত্রী মেহেনাজ। স্বামীর মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত না হলেও আশা ও আশঙ্কার মাঝখানে দিশেহারা পরিবারের সবার মুখে একটাই প্রশ্ন—
“নিশাত কি এখনও বেঁচে আছে?”

মাত্র ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে দালাল কুদ্দুসের মাধ্যমে ইতালিতে পৌঁছানোর স্বপ্নে গত ৩ অক্টোবর বাড়ি ছাড়েন নিশাত। সৌদি আরব–কুয়েত–মিশর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছে ১০ নভেম্বর সমুদ্র পথে যাত্রা শুরু করেন তিনি। সেই দিনই পরিবারে শেষবার যোগাযোগ করেছিলেন।

নিশাতের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“মাসের পর মাস খবর নাই। এখন বলে জাহাজ ডুইবা গেছে। আমার পোয়াটা কি আর ফিরবো না?”

২৩ বছরের ফারহান খান রোমান আগে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের ভাগ্য বদলানোর আশায় তিনি ইতালিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দালাল কুদ্দুস ১৮ লাখ টাকার চুক্তিতে তাকে লিবিয়া পাঠায়। সেখান থেকে ১২ নভেম্বর তিনি ইতালিগামী ট্রলারে ওঠেন। এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছেন—ট্রলারডুবিতে রোমানসহ অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু কারও মরদেহ উদ্ধার হয়নি এখনো।
এই অনিশ্চয়তা তাদের দুঃখকে আরও গভীর করে তুলেছে।

নিশাত ও রোমানের সঙ্গে মুন্সীকান্দির মুন্না, শিবচর পৌরসভার দুই যুবকসহ অন্তত অর্ধডজন তরুণও নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের দাবি—এরা সবাই একই দালালের হাতে প্রতারিত হয়ে একই নৌযাত্রায় ছিলেন।

ইতালিতে পৌঁছানোর আদর্শ দেখিয়ে লাখো টাকা হাতিয়ে নেওয়া দালালচক্রের কারণে আজ গ্রামের একের পর এক পরিবারে নেমে এসেছে মাতম। কারও হাতে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য, নেই কোনো সরকারি নিশ্চয়তা। শুধু অপেক্ষা—আর বুকের ভেতরে প্রবল শূন্যতা।

শিবচরের এই কয়েকটি বাড়ির কান্না যেন ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ের মতোই থামছে না।
তারা শুধু একটি খবর চায়—
প্রিয়জনরা কি এখনও বেঁচে আছে, নাকি সত্যিই সমুদ্রই তাদের শেষ ঠিকানা হয়ে গেল?