সেবা ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে ভবন: শিবচরে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে চরম ভোগান্তি


admin প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২২, ২০২৬, ৬:১৬ PM / ৮৬
সেবা ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে ভবন: শিবচরে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে চরম ভোগান্তি

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় মা ও শিশুদের জন্য নির্মিত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো এখন কার্যত নামমাত্র। আধুনিক অবকাঠামো, সুসজ্জিত ভবন—সবই আছে, কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধ। ফলে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য নির্মিত এসব মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র স্থানীয় মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে হতাশার প্রতীকে।

ভাণ্ডারীকান্দি ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের চিত্র প্রতিদিন একই রকম। সকাল থেকে দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে নারী ও শিশুরা চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা গর্ভকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশায় কেন্দ্রে এসে হাজির হন। কিন্তু অধিকাংশ দিনই তারা দেখেন—মূল ফটকসহ বেশির ভাগ কক্ষে ঝুলছে তালা। ভেতরে নেই কোনো চিকিৎসক, নেই সেবাকর্মীর উপস্থিতি।

একই অবস্থা বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের হাজী আবুল কাশেম উকিল মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রেও। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই কার্যক্রম বন্ধ থাকে। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসা না পেয়ে রোগীদের ছুটতে হয় উপজেলা সদর কিংবা জেলা শহরের দিকে, যা চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিবচরের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে তিনটি ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিরুয়াইল ইউনিয়নে আরও একটি হাসপাতাল নির্মাণাধীন। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতিতে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকসহ মোট ১০টি পদ থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। ফলে নিয়মিত সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আপাতত অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তাদের দিয়ে সপ্তাহে এক বা দুই দিন সীমিত আকারে সেবা দেওয়া হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে ক্ষোভ ও হতাশা স্পষ্ট। চরাঞ্চলের বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ডাক্তার দেখাতে এসে অনেক সময় তালা পাই। মাঝে মধ্যে খোলা থাকলে চিকিৎসা মেলে, না হলে ফিরে যেতে হয়।

আরেক রোগী সালমা খাতুন জানান, “জরুরি অবস্থায় অনেক দূর থেকে এসে ডাক্তার না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়—এর চেয়ে কষ্টের কিছু নেই।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আবদুল কাদের বলেন,
“মা ও শিশুদের জন্য হাসপাতাল বানানো হয়েছে, কিন্তু সেখানে যদি ডাক্তার ও ওষুধই না থাকে, তাহলে এই ভবনের কোনো মূল্য থাকে না। দ্রুত জনবল নিয়োগ না হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নতুন নিয়োগ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন হয় না। অবকাঠামোর পাশাপাশি দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিবচরের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে কোটি টাকার এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র কেবল ইট-পাথরের স্মারক হয়েই থেকে যাবে।