মাদারীপুরে ৩৩ কোটি টাকার নার্সিং কলেজ নির্মাণ থেমে আছে দুই বছর, মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত ভবন


admin প্রকাশের সময় : জুলাই ১৬, ২০২৬, ২:৪২ PM /
মাদারীপুরে ৩৩ কোটি টাকার নার্সিং কলেজ নির্মাণ থেমে আছে দুই বছর, মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত ভবন

আবুল হাসানাত (আকাশ), শিবচর প্রতিনিধি:

দেশের স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ নার্স তৈরির লক্ষ্যে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বড় দোয়ালি এলাকায় নির্মাণাধীন আধুনিক নার্সিং কলেজ প্রকল্পটি এখন অবহেলা, অনিয়ম ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের ৮৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করলেও নির্মাণকাজ শেষ না করেই প্রকল্প ছেড়ে চলে যায়। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে কলেজটির নির্মাণকাজ।

যে ক্যাম্পাসে ভবিষ্যতে নার্সিং শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হওয়ার কথা ছিল, সেই নির্মাণাধীন ভবন এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বড় দোয়ালি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো ক্যাম্পাস আগাছা, ঘাস ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে। নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম। চারদিকে মাদকের তীব্র দুর্গন্ধ। ভবনে নেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। দীর্ঘদিন অরক্ষিত থাকায় ভবনের বিভিন্ন কক্ষ থেকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী চুরির ঘটনাও ঘটেছে। নির্জন পরিবেশের সুযোগে ভবনটিতে নিয়মিত তরুণ-তরুণীদের আনাগোনা ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শিবচর উপজেলার বড় বাহাদুরপুর ও বড় দোয়ালি মৌজায় ২০২১ সালের ১০ মার্চ নার্সিং কলেজ নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং ২০২৪ সালের ২০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।

রাজধানীর মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়াভিত্তিক মেসার্স এমএনএইচসিএল ও এইচএমএইচই নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রকল্পটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠান দুটি অসমাপ্ত অবস্থায় কাজ ফেলে চলে যায়। এর আগেই কাজের অগ্রগতি ৮৮ শতাংশ দেখিয়ে তাদের ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান দুটির চুক্তি বাতিল করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো:শাহীন বলেন,
দীর্ঘদিন ধরে এখানে কোনো নির্মাণকাজ হচ্ছে না। ভবনটি এখন বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ না হলে ভবনের আরও ক্ষতি হবে।

আরেক বাসিন্দা মামুন বেপারী বলেন,
দিনে এলাকাটি নির্জন থাকলেও সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ এখানে চলাচল করতে ভয় পান। নিরাপত্তার অভাবে ভবনটি নানা ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত কলেজটির নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি আবুল খায়ের খান বলেন,দেশে দক্ষ নার্সের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তাই দ্রুত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে কলেজটি চালু করা গেলে দক্ষ জনবল তৈরি হবে, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবেন।

মাদারীপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন,অবশিষ্ট নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে আগের দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে।

দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার বড় দোয়ালি এলাকার এই সরকারি প্রকল্পটি এখন শুধু উন্নয়ন কার্যক্রমের স্থবিরতারই নয়, বরং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে নার্সিং কলেজটি চালু করা হবে, যাতে কোটি টাকার এই প্রকল্প তার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে।

2