

আবুল হাসানাত (আকাশ), শিবচর প্রতিনিধি:
বিকেল গড়াতেই শিবচরের রেললাইন ঘিরে জমে ওঠে মানুষের ভিড়। কেউ হাঁটছেন, কেউ বসে আড্ডা দিচ্ছেন, আবার কেউ রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে তুলছেন ছবি। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে ছুটে আসছেন স্টেশন এলাকায়। নতুন রেলপথকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের কৌতূহল ধীরে ধীরে এটিকে পরিণত করেছে বিনোদনের নতুন কেন্দ্রে। তবে আনন্দ আর অবসরের এই আয়োজনই অনেক সময় ডেকে আনছে ভয়াবহ পরিণতি। অসচেতনতা ও ঝুঁকিপূর্ণ চলাফেরার কারণে রেললাইন হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ।
রেলপথ চালুর পর শিবচর অংশে ট্রেনে কাটা পড়ে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রেললাইনে ঘোরাঘুরি ও ছবি তুলতে গিয়ে অন্তত ১৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত শিবচর অংশে ট্রেনে কাটা পড়ে কমপক্ষে অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে কেউ রেললাইন পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ আত্মহত্যা করেছেন।
শিবচরের পুলিয়া, মালিগ্রাম, সূর্যনগর ও পাঁচ্চর এলাকায় বিকেল নামলেই রেললাইনের আশপাশে মানুষের জটলা চোখে পড়ে। সন্ধ্যার পর কোনো কোনো এলাকায় সেই ভিড় আরও বেড়ে যায়। ট্রেন আসার শব্দ শুনে অধিকাংশ মানুষ সরে গেলেও কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
গত মাসেও শিবচরের সূর্যনগর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। রেল পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরেই এ এলাকায় রেল দুর্ঘটনায় অন্তত অর্ধডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথের দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটার। এর মধ্যে শিবচর এলাকায় রয়েছে পদ্মা ও শিবচর স্টেশন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে পদ্মা সেতু হয়ে এ পথে আংশিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পুরোপুরি চালু হয় রেল যোগাযোগ। বর্তমানে ঢাকার কমলাপুর থেকে রাজশাহী ও খুলনা রুটে এ পথে ট্রেন চলাচল করছে।
রেললাইনে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, ‘বাড়ির কাছেই রেললাইন। তাই বান্ধবীরা মিলে এখানে এসেছি। কিছুটা সময় কাটানো ও ছবি তোলার জন্য আসা। রেললাইনে ঝুঁকি আছে জানি, তারপরও অনেকেই এখানে ঘুরতে আসে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় রেললাইনটি নতুন। এ কারণে মানুষের কৌতূহলও বেশি। মাঝেমধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়েও স্টেশনে ঘুরতে আসি। তবে ট্রেন আসার সময় আমরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যাই। রেললাইন চালুর শুরুর দিকে শিবচরের পাঁচ্চর এলাকায় ছবি তুলতে গিয়ে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় তিনজনেরও মৃত্যু হয়েছিল।’
শিবচর-ভাঙ্গা রেলপথে দায়িত্ব পালনকারী রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাসির উদ্দিন বলেন, ‘প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। মানুষের অসচেতনতার কারণেই এ ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। বিকেল হলেই অনেকে রেললাইনে বসে আড্ডা দেন, হাঁটাহাঁটি করেন। অনেকেই ট্রেনের সময়সূচি সম্পর্কে জানেন না। আবার ট্রেন আসতে দেখেও কেউ কেউ রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করেন। ট্রেনের গতিবেগ সম্পর্কেও অনেকের ধারণা নেই। এসব কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে।’
শিবচর স্টেশনের মাস্টার মো. সেলিম হোসেন বলেন, ‘এই রেলপথটি খুবই গতিশীল। এখানে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ট্রেন চলাচল করে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রেললাইনে মানুষের হাঁটাহাঁটি বন্ধ করতে হবে। মানুষের অসচেতনতার কারণেই প্রাণহানি বেশি হচ্ছে। স্টেশনের আশপাশে দর্শনার্থীরা এলে আমরা তাঁদের সচেতন করার চেষ্টা করি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেললাইনে মানুষের অবাধ বিচরণ বন্ধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার সময়ে স্টেশন ও রেললাইনের আশপাশে নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয়দেরও রেললাইনে হাঁটাহাঁটি, আড্ডা ও ছবি তোলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
নতুন রেলপথকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল ও বিনোদনের প্রবণতা স্বাভাবিক হলেও রেললাইন কোনোভাবেই ঘোরাঘুরি বা ছবি তোলার নিরাপদ স্থান নয়। সময়মতো সতর্কতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে বিনোদনের এই ভিড়ই আরও প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :