
আবুল হাসানাত (আকাশ), শিবচর প্রতিনিধি:
দেশের কৃষি, মৎস্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে এখনও চরম অবহেলিত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ।
পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা দুটি চরে প্রায় চার বছর ধরে বসবাস করছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। অথচ তাদের জন্য নেই কোনো হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা স্থায়ী চিকিৎসক। ফলে সামান্য অসুস্থতা থেকে শুরু করে প্রসূতি সেবার মতো জরুরি ক্ষেত্রেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরবাসীর মূল যোগাযোগব্যবস্থা খেয়া নৌকা। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল হলেও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তাদের জীবন প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে।
চরটিতে সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। নেই সরকারি ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাও। ফলে সাধারণ রোগে আক্রান্ত হলেও স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে ঝাড়ফুঁক বা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। গুরুতর রোগীর একমাত্র ভরসা শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, যেখানে পৌঁছাতে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। প্রতিকূল আবহাওয়া, তীব্র স্রোত ও নৌযানের স্বল্পতার কারণে অনেক সময় রোগী পরিবহনই সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে পড়ে। নেই কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্সও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চরজানাজাত ইউনিয়নের ভূমিহীন এলাকা ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে পদ্মার বুকে নতুন চর জেগে ওঠে। ২০২২ সাল থেকে সেখানে মানুষ পুনরায় বসতি গড়ে তোলে। বর্তমানে ওই দুই চরে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস হলেও এখন পর্যন্ত সেখানে স্বাস্থ্যসেবার কোনো স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব কিংবা নবজাতকের চিকিৎসার কোনো সুযোগ না থাকায় অনেক নারী বাধ্য হয়ে বাড়িতেই সন্তান প্রসব করছেন। এতে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চরের বাসিন্দা জুরিনা বেগম বলেন,আমাদের এখানে কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। গত মাসে রাতে প্রসববেদনা উঠলেও নৌকা না পাওয়ায় ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। পরে নদী পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। মাঝরাতে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটত, তাহলে হয়তো বাঁচতাম না। সরকার দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করুক—এটাই আমাদের দাবি।
বৃদ্ধ দেলোয়ার বেপারি বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছি। অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাসপাতালে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। বহুবার হাসপাতাল ও রাস্তার প্রতিশ্রুতি শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।
দুই সন্তানের জননী ছালমা বেগম বলেন,চরের জীবন মানেই কষ্ট। চিকিৎসা, বাজার ও সন্তানদের লেখাপড়া—সবকিছুতেই দুর্ভোগ। ছেলে অসুস্থ হলে খুব ভয় লাগে। ডাক্তার নেই, ওষুধও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় কবিরাজের কাছে যেতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা কবির উদ্দিন বেপারী বলেন,চরের মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। এখানে চিকিৎসকসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মজিবর মিয়া বলেন,চরে কোনো সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেই। গুরুতর রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। আমরা যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি। দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর দাবি জানাই।
এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান জানান, জনবল ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংকটের কারণে দুর্গম চরাঞ্চলে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বর্তমানে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার সপ্তাহে দুই দিন স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। এছাড়া নতুন চর এলাকায় মাসে অন্তত একদিন চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ৩০ শতাংশ জমি ইউএনও কমিটির মাধ্যমে পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :