যে শিল্পে ছিল গ্রামের প্রাণ, আজ সে শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে — শিবচরের মৃৎশিল্পের গল্প


admin প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৩, ২০২৫, ৭:৫৪ PM / ৩৫৭
যে শিল্পে ছিল গ্রামের প্রাণ, আজ সে শিল্প টিকে থাকার লড়াইয়ে — শিবচরের মৃৎশিল্পের গল্প

একসময় মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বাজত কুমারদের চাকার টুংটাং শব্দ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাটি কাটা, গড়া, পোড়ানো আর রঙ তোলার ব্যস্ততায় মুখর থাকত পালপাড়া, সাহাপাড়া, শীলপাড়া, দাসপাড়াসহ আশপাশের জনপদ।

হাঁড়ি-পাতিল, দুধের পাত্র, ধূপতি, ভাতের ঢাকনা, মাটির ব্যাংক কিংবা কবুতরের খাবরা—সবই তৈরি হতো স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের হাতে।
আজ সেই দৃশ্য যেন অতীতের গল্প। আধুনিকতার ঢেউ আর প্লাস্টিক-অ্যালুমিনিয়ামের দাপটে বিলীন হতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী মাটির শিল্প।

এখন ভদ্রাসনের হাতে গোনা কয়েকজন কারিগরই আছেন—বিমল পাল, কবিতা পাল, কৃষ্ণ পাল, রন পাল, পন্নথ পাল, ভবনাথ পাল, বাবু পাল ও মড়াই পাল।
তারা এখনও প্রতিদিন ঘাম ঝরিয়ে তৈরি করছেন কবুতরের খাবরা, দধির পাত্র, ভাতের ঢাকনা, মাটির ব্যাংকসহ নানা পণ্য। কিন্তু আগের মতো ক্রেতা নেই, চাহিদাও নেই। একসময় পাইকারি বিক্রি করেই সংসার চলত, এখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে সামান্য দামে বিক্রি করতে হয়। দিনে ৩০–৪০টি পণ্য তৈরি করেও লাভের মুখ দেখা দায়।

মৃৎশিল্পী কবিতা পাল বলেন,
৩০ বছর ধরে এই কাজ করছি। একসময় এই পেশায় সংসার ভালোই চলত, এখন দিন কাটানোই কঠিন। মেয়ের বিয়েতে ঋণ নিতে হয়েছিল, এখনো কিস্তি দিচ্ছি। কবুতরের খাবরা বানাতে লাগে ৭ টাকা, বিক্রি হয় ১০ টাকায়। ভাতের ঢাকনা ৬ টাকায় বানিয়ে ৮ টাকায় বিক্রি করি—এভাবে কষ্ট করেও তেমন লাভ হয় না।

আরেক কারিগর শ্রীকৃষ্ণ পাল জানান, এটা আমাদের পিতৃপুরুষের পেশা। ছোটবেলা থেকে চাকায় মাটি ঘুরিয়ে বড় হয়েছি। কিন্তু এখন মানুষ মাটির জিনিসের দিকে ফিরছে না। দেশের অন্য জায়গায় মৃৎশিল্পীরা সরকারি সহায়তা পেলেও আমরা শুধু প্রতিশ্রুতিই শুনেছি, কোনো বাস্তব সহায়তা পাইনি।

মৃৎশিল্পী পন্নথ পাল বলেন,
আমি ফলের নকশা—যেমন তাল, আম, কাঁঠাল, আপেল, লিচু—দিয়ে মাটির ব্যাংক বানাই। আগে যেসব উপকরণ ৫০০ টাকায় কিনতাম, এখন তার দাম দুই হাজার। খরচই ওঠে না। তবু ভালোবাসা থেকেই কাজটা ছাড়তে পারি না।

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও ভদ্রাসন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল খালাসী জানান, আমাদের ছোটবেলায় পুরো ভদ্রাসনে কুমারদের চাকাই ছিল গ্রামের প্রাণ। এখন হাতে গোনা কয়েকজন টিকে আছেন। প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা মাটির পণ্যকে হারিয়ে দিচ্ছে, অথচ প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। সরকার যদি মাটির পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দেয় ও কারিগরদের সহায়তা করে, তাহলে এই ঐতিহ্য হয়তো আবার জেগে উঠবে।

শিবচর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির এক কর্মকর্তা বলেন,
মৃৎশিল্প শুধু জীবিকার উপায় নয়, এটি শিবচরের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। সরকারি প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া গেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

আজও ভদ্রাসনের কুমারদের হাতে যখন মাটি ঘুরে চাকায়, তখন তা রূপ নেয় হাঁড়ি, পাতিল বা ব্যাংকে—সেই মুহূর্ত যেন গ্রামীণ জীবনের অতীতকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। কিন্তু সময়ের স্রোতে যদি সহায়তার হাত না বাড়ে, তবে হয়তো একদিন মাটির এই গন্ধ, এই শিল্প, এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে ইতিহাসের গহ্বরে।