
আবুল হাসানাত (আকাশ), শিবচর প্রতিনিধি:
বাংলা প্রকৃতির ছয়টি ঋতু ঘুরে ঘুরে আসে বিচিত্র সৌন্দর্য নিয়ে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষা এক অনন্য ঋতু। বাংলার প্রকৃতিতে কদম ফুল আর বর্ষার ভালোবাসা চিরকালের। বর্ষার শুরুতেই কদম ফোটে বৃষ্টির ভালোবাসার ছোঁয়া নিতে। বৃষ্টিতে ভিজে নাচতে থাকে পুবালি বাতাসে। বৃষ্টিভেজা কদম দেখে যে কবি হৃদয় নেচে উঠেছে। পেয়েছে প্রশান্তি কত চোখ। কদম ফুল আর বর্ষার প্রেম দেখে তাই তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান/আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান। বর্ষা আর কদম ফুলের এই নিবিড় সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে বাঙালির সংস্কৃতি ও আবেগের অংশ হয়ে আছে।
প্রকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর এই ফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা মৌসুমে কদম ফুলের সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। পথে-প্রান্তরে কদম গাছগুলো ভরে উঠেছে ফুলে ফুলে। বৃষ্টিভেজা পুবালি বাতাসে দুলতে থাকা কদম ফুল যেন বর্ষাকে জানায় আপন অভিবাদন। একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি জনপদে দেখা মিলত কদম গাছের। কালের বিবর্তনে সেই সংখ্যা কমে গেলেও বর্ষা এলেই প্রকৃতি এখনো তার নিজস্ব আয়োজনে কদম ফুলের সৌন্দর্য মেলে ধরে।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে বিভিন্ন স্থানে দেখা মিলছে কদম ফুলের। এই বিরামহীন বর্ষনে গাছের শাখে শাখে সবুজ পাতার আড়ালে ফুটে উঠেছে অসংখ্য কদম ফুল। উপজেলার শিবচর-পাঁচ্চর সড়কের দুই পাশে অসংখ্য কদম ফুল গাছ দেখা গেছে। যেখানে সবুজ পাতার ফাঁকে উকি দিচ্ছে হলুদ বর্নের অসংখ্য কদম ফুল। অনেক শিক্ষার্থীকেই দেখা গেছে কদম ফুল হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় আষাঢ়-শ্রাবন এলেই কদম গাছ ফুলে ফুলে ভরে উঠত। তরুণ-তরুণীরা প্রিয়জনকে কদম ফুল উপহার দিতেন, মেয়েরা খোঁপায় গুঁজতেন এই ফুল। শিশুরা কদম ফুল নিয়ে খেলায় মেতে উঠত। কদম গাছের কাঠও বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহার হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফলজ ও বাণিজ্যিক গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় কমে গেছে কদম গাছের সংখ্যা। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার এই ঐতিহ্যের একটি অংশ।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী রুহুল আমিন বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার এবং খোলা জায়গায় বেশি করে কদম গাছ রোপণ করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বাংলার এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।
কলেজ শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, কদম ফুল আমাদের বর্ষার অন্যতম সৌন্দর্য। ছোটবেলায় খোঁপায় কদম ফুল পরার অনেক স্মৃতি আছে। এখন আগের মতো কদম গাছ চোখে পড়ে না। তাই এই গাছ সংরক্ষণ করা জরুরি।
উপজেলা উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, মানুষ এখন কদম গাছের বদলে মেহগনিসহ অন্য দামি গাছ রোপণে ঝুঁকছে। তাই উপজেলায় আগের মতো আর কদম গাছ নেই। সৌন্দর্যেও মন ভালো রাখতে হলে কদম ফুলের বিকল্প নেই। এবর্ষায় আমাদের সবাইকে একপক্ষে ১টি করে কদম ফুলের গাছ লাগানো প্রয়োজন।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ.এম ইবনে মিজান বলেন, বর্ষা এলেই কদম ফুলে সেজে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। কদম ফুল আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। গন্ধে, বর্ণে, সৌন্দর্যে ও ঔষধি গুণে কদমগাছ পরিপূর্ণ হলেও কালের বিবর্তনে হ্রাস পাচ্ছে কদম গাছের সংখ্যা। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সব ধরনের গাছ রোপণ ও সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :