শিবচরে জেলের পরিচয়ে সুবিধা ভোগ,আড়ালে ভিন্ন পেশার মানুষ


admin প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ২:০০ PM /
শিবচরে জেলের পরিচয়ে সুবিধা ভোগ,আড়ালে ভিন্ন পেশার মানুষ

আবুল হাসানাত (আকাশ), শিবচর প্রতিনিধি:

মাদারীপুরের শিবচরে জেলে না হয়েও জেলে কার্ড ব্যবহার করে বছরের পর বছর সরকারি খাদ্যসহ বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যানচালকসহ স্বচ্ছল অনেক মানুষের নাম থাকলেও পদ্মা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা বহু প্রকৃত জেলের নামই নেই সরকারি তালিকায়।

ফলে সরকারি সহায়তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নদীনির্ভর এসব মৎস্যজীবী। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠতা কিংবা তদবিরের মাধ্যমে অনেকেই জেলে তালিকায় স্থান পেলেও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা প্রকৃত জেলেদের একটি বড় অংশ রয়ে গেছেন তালিকার বাইরে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিবচর উপজেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। এর মধ্যে শিবচর পৌরসভায় ২৯৯ জন, বন্দরখোলা ইউনিয়নে ৬৭২, সন্ন্যাসীরচরে ১৭০, বহেরাতলা দক্ষিণে ৩৪৫, চরজানাজাতে ৯৫১, কাঁঠালবাড়িতে ৪২১, মাদবরের চরে ২৮৭, বহেরাতলা উত্তরে ৮৯, ভান্ডারীকান্দিতে ২২০, বাঁশকান্দিতে ৫৬৪, নিলখীতে ৪৮৮, শিরুয়াইলে ৩৫৩, দত্তপাড়ায় ৪৩২, কাদিরপুরে ২৮৫, কুতুবপুরে ১৯৬, পাঁচ্চরে ১৫৪, দ্বিতীয়খণ্ডে ১৬৩, উমেদপুরে ১৬৬ এবং ভদ্রাসনে ২৭৬ জনকে নিবন্ধিত জেলে হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

প্রতি বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উপজেলা মৎস্য অফিসের উদ্যোগে জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করার নিয়ম রয়েছে। এ জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটিও রয়েছে। তবে মৎস্য অফিসের দাবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তালিকার ভিত্তিতেই অনেক ক্ষেত্রে জেলেদের নিবন্ধন করা হয়েছে। এখন তালিকাটি পুনরায় যাচাই-বাছাই করে হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পদ্মা নদীর তীরবর্তী চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বংশপরম্পরায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক জেলের হাতে নেই সরকারি জেলে কার্ড।

চরজানাজাত ইউনিয়নের জেলেরা জানান, তাদের পরিবারের দুই থেকে তিন পুরুষ ধরে পদ্মায় মাছ শিকার করেই জীবিকা চলে। নদীতে মাছ ধরা ছাড়া তাদের বিকল্প কোনো আয়ের পথ নেই। অথচ সরকারি তালিকায় তাদের নাম নেই। ফলে জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্য সহায়তাও তারা পান না।

অন্যদিকে, যারা জীবনে কখনো মাছ ধরেননি, এমন ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যানচালক ও স্বচ্ছল ব্যক্তিদের অনেকের কাছেই রয়েছে জেলে কার্ড। স্থানীয় জেলেদের দাবি, তালিকায় এমন ভুয়া জেলের সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে। বিপরীতে প্রকৃত জেলে বাদ পড়েছেন কয়েক শত।

সরেজমিনে চরজানাজাত ইউনিয়নের আয়নাল খা, ইলিয়াস বেপারী, বাচ্চু মোড়লসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার বেশ কয়েকজনের নাম জেলে তালিকায় পাওয়া যায়। স্থানীয়দের দাবি, এদের অনেকেই পেশাদার মৎস্যজীবী নন।

একই এলাকার তালিকাভুক্ত আয়না খা ও মালেক ফকিরসহ কয়েকজনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তারা বাড়ির আশপাশে কৃষিকাজ করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তারাও নিয়মিত জেলে হিসেবে সরকারি চাল পেয়েছেন।

পদ্মা নদীতে মাছ শিকাররত অবস্থায় কথা হয় চরজানাজাত ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খোকন হাওলাদার ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বজলু খার সঙ্গে।

খোকন হাওলাদার বলেন,আমাদের কয়েক পুরুষ ধরে নদীতে মাছ ধরে সংসার চলে। কিন্তু আমার নিজের কিংবা পরিবারের কারও জেলে কার্ড নেই। সরকারি কোনো সহায়তাও পাই না।

বজলু খার অভিযোগ, জেলে তালিকায় নাম তুলতে হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ হতে হয়। তাদের ভাষায়, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছের লোক না হলে জেলে কার্ড পাওয়া কঠিন।

স্থানীয় একাধিক জেলে জানান, তারা বছরের অধিকাংশ সময় নদীতে মাছ ধরেই কাটান। কখন তালিকা তৈরি হয়, কখন যাচাই হয়—এসব বিষয়ে তারা অনেক সময় কিছুই জানতে পারেন না।

তাদের অভিযোগ, তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য তদবির করার সুযোগও তাদের নেই। ফলে যারা জনপ্রতিনিধিদের কাছে যেতে পারেন বা প্রভাব খাটাতে পারেন, তাদের অনেকেই জেলে তালিকায় ঢুকে পড়েন। অন্যদিকে প্রকৃত জেলেরা থেকে যান সরকারি সুবিধার বাইরে।

জেলেদের আরও অভিযোগ, ভুয়া জেলেদের কারণে সরকারি খাদ্য সহায়তা বিতরণেও নানা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। প্রকৃত জেলেরা অর্থ দিতে কিংবা তদবির করতে না পারায় অনেক সময় তারা তালিকায় স্থান পান না।

জেলেদের তালিকায় অনিয়মের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর শিবচর উপজেলা সভাপতি আবুল খায়ের খান বলেন, শিবচরে অতীতে জেলেদের একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করা হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ লোকজনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন পেশার মানুষ ও স্বচ্ছল ব্যক্তিরাও জেলে হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।

শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, জেলে তালিকায় কোনো অপ্রকৃত জেলের নাম থাকলে এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে সেই নাম বাদ দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ইলিশ আহরণ ও মৎস্য পেশার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রকৃত জেলেদের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলেদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ.এম. ইবনে মিজান বলেন,জাল যার, তিনিই প্রকৃত জেলে। এর বাইরে অন্য কোনো পেশার ব্যক্তির জেলে তালিকায় থাকার সুযোগ নেই।

তিনি আরও বলেন, মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে জেলে তালিকা পুনরায় যাচাই করা হবে। প্রকৃত জেলেদের তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি অন্য পেশার কেউ তালিকায় থাকলে তাদের বাদ দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় জেলেদের প্রত্যাশা, শুধু কাগজে-কলমে তালিকা হালনাগাদ না করে নদীতে গিয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের শনাক্ত করা হবে। তাহলে একদিকে যেমন ভুয়া জেলেদের সরকারি সুবিধা নেওয়া বন্ধ হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের অধিকারও নিশ্চিত হবে।

2